মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

আগৈলঝাড়া উপজেলার পটভূমি

শিক্ষা সংস্কৃতির ঐতিহ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ইতিহাস সমৃদ্ধ স্থান বৃহত্তর আগৈলঝাড়া। আদিকাল থেকেই এখানকার রাজনৈতিক ইাতহাস সাহসী ও সংগ্রামী ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার ৫২ এর ভাষা আন্দলোন ৬৬ এর ৬ দফা ৬৯ এর গণঅভ্যূথান ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে এখানকার ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অবদান অবিস্মরণীয়। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলনই ছিল দুর্বার। এসব আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দানকারী নেতৃবৃন্দ বরাবরই সম্প্রদায়িক সম্প্রতি বজায় রেখেই কাধে কাধ মিলিয়ে একাত্ম হয়ে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাপিয়ে পরে ছিল। সময়ের বিবর্তনে এখানকার শিক্ষা সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার বর্তমান অবস্থা কিছুটা  ¤¬ান হলেও প্রাচীন ইতিহাস ছিল ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। বৃহত্তর আগৈলঝাড়ার রাজনৈতিক শিক্ষা সংস্কৃতিক ইতিহাস তুলেধরা খুবেই কষ্টকর। কেননা ঐতিহ্য সংগ্রামের ইতিহাস থাকলেও সংরক্ষণ ও প্রবীণ নেতৃবৃন্দ অনেকেই বেঁচে না থাকায় ব্যাপক ইতিহাস তুলেধরা খুবেই কষ্টকর। আগৈলঝাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে যাদের পদচারণা ছিল তাদের মধ্যে মহাত্মা অশ্বীনি কুমার দত্ত, যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল, শান্তি রঞ্জন, আব্দুল মাজেদ কাজী, মাওলানা আবুল কাসেম, সৈয়দ আলীউদ্দিন বাহাদুর, ওহাব খান, সুনীল কুমার গুপ্ত, মিহির দাস গুপ্ত ও মুজিব রহমান চাঁন মাষ্টারের নাম উলে¬খ্যযোগ্য। ১৯৫০ সালে কেন্দ্রীয় ভাবে সুনীল কুমার গুপ্তকে বরিশাল জেলার কমিউনিষ্ট পার্টির সম্পাদকের দ্বায়িত্ব দিয়ে এলাকায় পাঠানো হলেও মূলত বরিশাল জেলার কমিউনিষ্ট পার্টির পরিচালনা করতেন ফরিদপুর জেলার কমিউনিষ্ট পার্টির সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সদস্য ভেদরগঞ্জের শান্তি রঞ্জন সেন। এ সময় গৈলার মুজিবর রহমান চাঁন কমিউনিষ্ট পার্টিতে সম্পৃক্ত হয়ে ছাত্রদের মাঝে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালের পূর্বে এখানে রাজনৈতিক ভাবে দুইটি ধারা প্রবাহিত ছিল। একটি কংগ্রেস’র নিয়ন্ত্রনাধীন অনুশীলন ও যুগান্তর নামে দুইটি চরমপন্থী সংগঠন ছিল। তারা গৈলা, বার্থী ও বাগধা কেন্দ্রীক সাংগঠনিক তৎপরতা চালাত। অপরদিকে মুসলিম লীগ ও তফসীল ফেডারেশন নিয়ন্ত্রিত কৃষক অন্দোলন। এর কেন্দ্রীয় নেতা ছিল বাংলার বাঘ নামে খ্যাত শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। স্থায়ীয় নেতা ছিলেন যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল। মাওলানা আব্দুল কাসেম, আব্দুল মাজেদ কাজী, আজাহার তালুকদার। তফসীল ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। মুসলীম লীগের নেতা হন মাওলানা আবুল কাশেম, সৈয়দ আলাউদ্দিন, কৃষক প্রজাপার্টির নেতৃত্ব দেন আব্দুল মাজেদ কাজী ও আজাহার তালুকদার। ফেডারেশন নেতা হিসাবে যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল মুসলিম লীগের সাথে থেকে যান ৪৭ এর পরে। এ অঞ্চলে দুটি বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত হয় তার একটি হয় আগৈলঝাড়া নিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মেলন। এর নেতৃত্ব দেন আব্দুল মাজেদ কাজী ও যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল। অপর আন্দোলনটি বাটাজোর এর অশ্বীনি কুমার দত্ত আয়োজিত কাটা বট গাছতলায় বৈশাখ মেলার বিরুদ্ধে। এর নেতৃত্ব দেন খান বাহাদুর ওহাব খান। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সরকার বিরোধী নেতা তারক চন্দ্র সেন রাজনৈতিক ইতিহাসে এখনো উজ্জল নক্ষত্র হিসাবে বিদ্যমান। সরকার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে ভারতে গ্রেফতার হয়ে আটকাদেশ অবস্থায় ভারতের হিজরী জেলে পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে। এর প্রতিবাদে সারা ভারতবর্ষ জুরে ক্ষোভ বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রবীণ রাজনৈতিকবিদদের কাছ থেকে জানা যায়, তারক সেনের মৃত্যুর পর তার চিতার ভস্ম নিয়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু গৈলায় আসেন এবং তারক সেনের স্মৃতি স্তম্ভ নির্মান করেন। যার ক্ষয়িষ্ণু অংশ বর্তমান গৈলা স্কুলের দক্ষিন পার্শ্বে অবস্থিত। রাজনৈতিক সংগ্রামের ঐতিহ্য ধারা ৬৬ এর ৬ দফা, ৬৯ এর গনঅভ্যুত্থান ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অব্যহত থাকে। ১৯৭১ সালে ২৪ সে মার্চ ঢাকায় ভয়াল কালো রাত্রী হিসাবে খ্যাত পাক হানাদার বাহিনী ঐ রাতে ঢাকায় নরকীয় হত্যাযজ্ঞ চালালে এ অঞ্চলের ছাত্র জনতার মাঝে বিদ্রোহের লেলিহানশিখা ছড়িয়ে পড়ে। তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য সংঘটিত হতে থাকে। দক্ষিণাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের অবদান রাখার জন্য যারা স্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের মধ্যে নিজামুদ্দিন অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাক হানাদারদের প্রতিরোধ ৭১ এর ২৫ শে এপ্রিল সাউদের খালপাড় (কটকস্থল) সম্মুখে যুদ্ধে প্রথম নিজের জীবনকে বিসর্জন দেন শহীদ আবুল হাসেম, সিপাহী আলাউদ্দিন, মোক্তার হোসেন ও পরিমল মন্ডল। আগৈলঝাড়া এলাকার কৃষকনেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, আবদুল করিম সরদার সাবেক (এম.এল.এ) এর উদ্যোগে প্রথম মুক্তি সেনাদল গঠিত হয়। দলের প্রধান ছিলেন মতিয়ার রহমান তালুকদার। এ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধে হেমায়েত বাহিনীর সৈনিকরা ছিল বিচক্ষণ ও সাহসী। কোটালীপাড়া নিবাসী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্ব এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। পরবর্তীতে হোসনাবাদের নিজামুদ্দিন আকনের নেতৃত্ব ৬৫ জন মুক্তি বাহিনী ভারত থেকে প্রশিক্ষণের পর গৌরনদীতে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর নেতৃত্ব দেন আবুল হাসানাত আবদুল¬াহ (সাবেক চীফ হুইপ) তার সহযোগী ছিলেন হাফেজ মাঝি, আঃ রকিব সেরনিয়াবাত, শাহ আলম তালুকদার ও মোঃ নুরুল ইসলাম মিয়া। গৌরনদীর প্রবীণ রাজনৈতিক ধারা সমুন্নত রেখেই এখানকার প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে ওঠে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের রুপকার ছিলেন তৎকালীন ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি, বর্তমান বি.এন.পির স্থানীয় কমিটির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য এম. জহির উদ্দিন স্বপন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তৎকালীন সময়ে যারা নেতৃত্ব দান করেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা প্রয়াত খায়রুল আহসান টিপু, তৎকালীন ছাত্রনেতা এইচ.এম জহিরুল ইসলাম জহির, প্রয়াত এইচ.এম কামাল হোসেন। ওই আন্দোলনের সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের গৌরনদীর আহবায়ক ছিলেন এইচ.এম জহুরুল ইসলাম জহির বর্তমানে দৈনিক প্রথম আলোর গৌরনদীর প্রতিনিধি। রাজনৈতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি এক সময়ে শিক্ষা, সাংস্কৃতি ও ক্রীড়ায় বৃহত্তর আগৈলঝাড়ার ঐতিহ্য দেশব্যাপী আলোরন সৃষ্টি করেছিল। আজ সে ঐতিহ্য অনেকটা বিলুপ্তির পথে। শিক্ষায় ও এখানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে যশোরে শিক্ষা বোর্ডে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে এখানকার মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা। শিক্ষার প্রতিভা বিকাশের সাথে সাথেই আগৈলঝাড়ার সাংস্কৃতি অঙ্গনের ঐতিহ্যও ছিল জাতীয় পর্যায়ের দাবীদার। ত্রিশ শতক পর্যন্ত চন্দ্রদ্বীপে বাংলা ভাষা লালিত পালিত হয়েছে বাংলা ভাষার অন্যতম স্থান বাকলায়। বাকলা ছিল প্রাচীন সাংস্কৃতির প্রথম স্থান। লক্ষণ সেনের সভাকবি ছিলেন গোবর্দ্ধন আর্চায্য। ক্রীড়াঙ্গনে যে গৌরব সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল তা আজ প্রায় রুপ কথায় পরিণত হয়েছে। বৃহত্তর আগৈলঝাড়ার প্রাচীন ঐতিহাসিক স্থাপত্য সমৃদ্ধের সাক্ষর আজও গ্রাম বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কালের সাক্ষী হিসেবে রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গৈলার কালুপাড়া বিজয় গুপ্তের মনসা মন্দির, ফুল্লশ্রী তাজমহল সহ বহু প্রাচীন স্থাপত্য।