মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংষ্কৃতি

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) : শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ইতিহাস সমৃদ্ধ স্থান বৃহত্তর আগৈলঝাড়া। আগৈলঝাড়া রাজনৈতিক অঙ্গনে যাদের পদচারণা ছিল তাদের মধ্যে মহাত্মা অশ্বীনি কুমার দত্ত, যোগেন্দ্র নাথ ম-ল, শান্তি রঞ্জন, আব্দুল মাজেদ কাজী, মাওলানা আবুল কাসেম, সৈয়দ আলীউদ্দিন বাহাদুর, ওহাব খান, সুনীল কুমার গুপ্ত, মিহির দাস গুপ্ত ও মুজিবর রহমান চাঁন মাস্টারের নাম উল্লেখযোগ্য।

১৯৫০ সালে কেন্দ্রীয়ভাবে সুনীল কুমার গুপ্তকে বরিশাল জেলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে এলাকায় পাঠানো হলেও মূলত বরিশাল জেলার কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালনা করতেন ফরিদপুর জেলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সদস্য ভেদরগঞ্জের শান্তি রঞ্জন সেন। এ সময় গৈলার মুজিবর রহমান চাঁন কমিউনিস্ট পার্টিতে সম্পৃক্ত হয়ে ছাত্রদের মাঝে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেন।

১৯৪৭ সালের পূর্বে এখানে রাজনৈতিকভাবে দুইটি ধারা প্রবাহিত ছিল। একটি কংগ্রেস এর নিয়ন্ত্রণাধীন অনুশীলন ও যুগান্তর নামে দুইটি চরমপন্থী সংগঠন ছিল। তারা গৈলা, বার্থী ও বাগধা কেন্দ্রিক সাংগঠনিক তৎপরতা চালাত। অপরদিকে মুসলিম লীগ ও তফসীল ফেডারেশন নিয়ন্ত্রিত কৃষক অন্দোলন। এর কেন্দ্রীয় নেতা ছিল বাংলার বাঘ নামে খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। স্থায়ীয় নেতা ছিলেন যোগেন্দ্র নাথ ম-ল। মাওলানা আব্দুল কাসেম, আব্দুল মাজেদ কাজী, আজাহার তালুকদার। তফসিল ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। মুসলিম লীগের নেতা হন মাওলানা আবুল কাশেম, সৈয়দ আলাউদ্দিন, কৃষক প্রজাপার্টির নেতৃত্ব দেন আব্দুল মাজেদ কাজী ও আজাহার তালুকদার। ফেডারেশন নেতা হিসাবে যোগেন্দ্র নাথ ম-ল মুসলিম লীগের সাথে থেকে যান ৪৭ এর পরে। এ অঞ্চলে দুটি বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত হয় তার একটি হয় আগৈলঝাড়া নিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মেলন। এর নেতৃত্ব দেন আব্দুল মাজেদ কাজী ও যোগেন্দ্র নাথ ম-ল। অপর আন্দোলনটি বাটাজোর এর অশ্বীনি কুমার দত্ত আয়োজিত কাটা বটগাছ তলায় বৈশাখ মেলার বিরুদ্ধে। এর নেতৃত্ব দেন খান বাহাদুর ওহাব খান।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সরকারবিরোধী নেতা তারক চন্দ্র সেন রাজনৈতিক ইতিহাসে এখনো উজ্জ¦ল নক্ষত্র হিসাবে বিদ্যমান। সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে ভারতে গ্রেফতার হয়ে আটকাদেশ অবস্থায় ভারতের হিজরী জেলে পুলিশ তাকে গুলী করে হত্যা করে। এর প্রতিবাদে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে ক্ষোভ বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রবীণ রাজনৈতিকবিদদের কাছ থেকে জানা যায়, তারক সেনের মৃত্যুর পর তার চিতার ভস্ম নিয়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু গৈলায় আসেন এবং তারক সেনের স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করেন। যার ক্ষয়িষ্ণু অংশ বর্তমান গৈলা স্কুলের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থিত। রাজনৈতিক সংগ্রামের ঐতিহ্য ধারা ৬৬ এর ৬ দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অব্যাহত থাকে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাক হানাদারদের প্রতিরোধ ৭১ এর ২৫শে এপ্রিল সাউদের খালপাড় (কটকস্থল) সম্মুখে যুদ্ধে প্রথম নিজের জীবনকে বিসর্জন দেন শহীদ আবুল হাসেম, সিপাহী আলাউদ্দিন, মোক্তার হোসেন ও পরিমল ম-ল। আগৈলঝাড়া এলাকার কৃষকনেতা আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, আবদুল করিম সরদার সাবেক (এমএলএ)-এর উদ্যোগে প্রথম মুক্তি সেনাদল গঠিত হয়। দলের প্রধান ছিলেন মতিয়ার রহমান তালুকদার।

এ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধে হেমায়েত বাহিনীর সৈনিকরা ছিল বিচক্ষণ ও সাহসী। কোটালীপাড়া নিবাসী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্ব এ অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। পরবর্তীতে হোসনাবাদের নিজামুদ্দিন আকনের নেতৃত্ব ৬৫ জন মুক্তিবাহিনী ভারত থেকে প্রশিক্ষণের পর গৌরনদীতে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে মুজিববাহিনীর নেতৃত্ব দেন আবুল হাসানাত আবদুল¬াহ (সাবেক চীফ হুইপ) তার সহযোগী ছিলেন হাফেজ মাঝি, আঃ রকিব সেরনিয়াবাত, শাহ আলম তালুকদার ও মোঃ নুরুল ইসলাম মিয়া। রাজনৈতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি এক সময়ে শিক্ষা, সাংস্কৃতি ও ক্রীড়ায় বৃহত্তর আগৈলঝাড়ার ঐতিহ্য দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আজ সে ঐতিহ্য অনেকটা বিলুপ্তির পথে। শিক্ষায় ও এখানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে যশোরে শিক্ষা বোর্ডে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে এখানকার মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা। শিক্ষার প্রতিভা বিকাশের সাথে সাথেই আগৈলঝাড়ার সাংস্কৃতি অঙ্গনের ঐতিহ্যও ছিল জাতীয় পর্যায়ের দাবীদার। ত্রিশ শতক পর্যন্ত চন্দ্রদ্বীপে বাংলা ভাষা লালিত পালিত হয়েছে বাংলা ভাষার অন্যতম স্থান বাকলায়। বাকলা ছিল প্রাচীন সাংস্কৃতির প্রথম স্থান। লক্ষণ সেনের সভাকবি ছিলেন গোবর্ধ্বন আচার্য্য। ক্রীড়াঙ্গনে যে গৌরব সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল তা আজ প্রায় রূপ কথায় পরিণত হয়েছে। বৃহত্তর আগৈলঝাড়ার প্রাচীন স্থাপত্য সমৃদ্ধের স্বাক্ষর আজও গ্রাম বাংলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গৈলার কালুপাড়া বিজয় গুপ্তের মনসা মন্দির, ফুল্লশ্রীর তাজমহল সহ বহু প্রাচীন স্থাপত্য।